ইতিহাসের দর্পণে ১৯৬৬-র গো-রক্ষা আন্দোলন: করপাত্রী মহারাজ ও ইন্দিরা গান্ধীর সেই ‘অভিশপ্ত’ অধ্যায়

ভারতের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের ৭ই নভেম্বর একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং বিতর্কিত দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনটি ছিল ‘গোপষ্টমী’। দিল্লির সংসদ ভবনের সামনে কয়েক লক্ষ সাধু-সন্ত ও গো-ভক্তদের ওপর পুলিশের গুলিচালনা এবং এর সাথে জড়িয়ে থাকা স্বামী করপাত্রী মহারাজের ‘অভিশাপ’ আজও জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাসের প্রেক্ষাপট

জনশ্রুতি এবং আধ্যাত্মিক গ্রন্থসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক প্রয়াণের পর যখন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে জটিলতা চলছিল, তখন ইন্দিরা গান্ধী আশীর্বাদের জন্য প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক স্বামী করপাত্রী মহারাজের শরণাপন্ন হন। করপাত্রী মহারাজ ছিলেন তৎকালীন হিন্দু সমাজের এক প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশীর্বাদ দিলেও একটি শর্ত দিয়েছিলেন— প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাকে দেশজুড়ে ‘গো-বংশ’ হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। বলা হয়, ক্ষমতায় আসার মোহে ইন্দিরা গান্ধী সেই সময় এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

৭ নভেম্বর ১৯৬৬: সংসদ ভবনের সামনে সেই রক্তক্ষয়ী দিন

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বেশ কিছু সময় অতিক্রান্ত হলেও যখন গো-হত্যা নিষিদ্ধ করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তখন করপাত্রী মহারাজের নেতৃত্বে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধু-সন্তরা দিল্লিতে এক বিশাল আন্দোলনের ডাক দেন।

 * ঘটনা: ১৯৬৬ সালের ৭ই নভেম্বর, গোপষ্টমীর পুণ্য তিথিতে লক্ষাধিক নিরপরাধ সাধু ও গো-ভক্ত সংসদ ভবন ঘেরাও করেন।

 * সরকারি পদক্ষেপ: তৎকালীন সরকারের নির্দেশে পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে লাঠিচার্জ এবং পরবর্তীতে সরাসরি গুলি চালায়।

 * পরিণতি: প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গুলিতে শত শত সাধু শহীদ হন এবং দিল্লির রাজপথ গেরুয়া বসন ও রক্তে রঞ্জিত হয়। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা অনেক কম দেখানো হয়েছিল।

স্বামী করপাত্রী মহারাজের ‘অভিশাপ’ ও কাকতালীয় মিল

এই হত্যাকাণ্ডে মর্মাহত ও ক্রুদ্ধ হয়ে করপাত্রী মহারাজ জনসমক্ষে ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন— "যে হাত দিয়ে তোমাকে আশীর্বাদ করেছিলাম, আজ সেই হাত দিয়েই তোমার বিনাশের ঘোষণা করছি।" প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন যে দিনটিতে (গোপষ্টমী) নিরপরাধ সাধুদের রক্ত ঝরানো হয়েছে, সেই একই তিথিতেই ইন্দিরা গান্ধীর বংশের পতন শুরু হবে এবং তার মৃত্যুও গুলিতেই হবে।

ঐতিহাসিক তথ্যের মিল:

 * ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী তার নিজের দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। ঘটনাক্রমে সেই দিনটিও ছিল ‘গোপষ্টমী’।

 * পরবর্তীতে তার ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং বড় ছেলে রাজীব গান্ধীর বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু— এই ঘটনাগুলোকে অনেকে সেই আধ্যাত্মিক পরিণতির অংশ হিসেবেই দেখেন।

তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণাদি

এই ঘটনার বিবরণ ও করপাত্রী মহারাজের রাজনৈতিক দল ‘রাম রাজ্য পরিষদ’-এর সাথে সরকারের সংঘাতের কথা বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়:

 * ধর্ম সম্রাট স্বামী করপাত্রী (শ্রীধর শাস্ত্রী): এই বইটিতে করপাত্রী মহারাজের জীবনী ও ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তার সম্পর্কের অবনতির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

 * মহর্ষির অনন্য নিষ্ঠা (করপাত্রী জির জীবনী): এখানে ১৯৬৬ সালের সেই রক্তাক্ত দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা পাওয়া যায়।

 * দ্যা লাইফ অফ ইন্দিরা গান্ধী (ক্যাথরিন ফ্র্যাঙ্ক): বিদেশি লেখিকা হওয়া সত্ত্বেও ফ্র্যাঙ্ক তার বইতে ১৯৬৬ সালের ‘গ্রেট কাউ স্লটার এজিটেশন’-কে ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 * মনমোহন শর্মা (প্রবীণ সাংবাদিক): সাংবাদিক মনমোহন শর্মার প্রতিবেদনগুলিতেও সংসদ ভবনের সামনে সেই গণহত্যামূলক পরিস্থিতির গুরুত্ব উঠে এসেছে।

উপসংহার: ১৯৬৬ সালের সেই ঘটনা কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, বরং তা ছিল ভারতের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও প্রশাসনিক ক্ষমতার এক চরম সংঘাত। স্বামী করপাত্রী মহারাজের সেই বাণী এবং পরবর্তী ঘটনাক্রম আজও ভারতের ইতিহাসে এক রহস্যময় এবং গম্ভীর অধ্যায় হিসেবে সংরক্ষিত।

জয় হিন্দ, ভারত মাতা কি জয়!🇮🇳

Comments

Popular posts from this blog

আমি কেন গান্ধীকে হত্যা করেছি!

বড়দিনকে হিন্দুয়ানায় বেঁধেছিলেন স্বামীজি, তুলসী-পূজনেও সে বাঁধন অটুট।

প্রসঙ্গ মরিচঝাঁপি।