প্রসঙ্গ মরিচঝাঁপি।

আমরা ভুলবও না, ভুলতে দেবও না।

মরিচঝাঁপি সুন্দরবনের একটি দ্বীপ—মূল ভূখণ্ড থেকে বহু দূরে, চারদিক নোনা জলে ঘেরা। এই দ্বীপের ইতিহাস শুধু একটি ভূখোলিক পরিচয়ের নয়, এটি বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের বেদনা, বঞ্চনা ও রক্তের ইতিহাস।

দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে বহু বাঙালি হিন্দু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে আসে। প্রথম সারির উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষরা কোনওভাবে কলকাতা ও অন্যান্য এলাকায় ঠাঁই পেলেও, দ্বিতীয় সারির বিপুল সংখ্যক নিম্নবিত্ত নমঃশূদ্র হিন্দু উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়নি। তাদের জোর করে পাঠানো হয় দণ্ডকারণ্যের পাথুরে, জঙ্গলাকীর্ণ, আতিথেয়তাশূন্য অঞ্চলে—মূলত ওড়িশ্যা ও মধ্যপ্রদেশে।

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন মন্ত্রী রাম চ্যাটার্জী দণ্ডকারণ্যের উদ্বাস্তু শিবিরে গিয়ে তাদের পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। সেই আশ্বাস ছিল মিথ্যে।

ভাষাগত সমস্যা, খাদ্য ও পানীয়ের অভাব, ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠলে ১৯৭৮ সালে হাজার হাজার উদ্বাস্তু আবার বাংলার পথে রওনা দেন। কিন্তু তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার রাজ্য নীতিতে পরিবর্তন এনে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—এই উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক নয়।

প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ দণ্ডকারণ্য ছেড়ে ফেরার চেষ্টা করলে অনেককে আটক করা হয়, বিতাড়িত করা হয়। কিছু মানুষ আগুন জ্বালিয়ে, বাধা পেরিয়ে কোনওরকমে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে সক্ষম হন। আর যাঁরা ঢুকতে পারেননি, তাঁরাই আশ্রয় নেন মরিচঝাঁপিতে।

এই মানুষগুলো নিজের উদ্যোগে জঙ্গল পরিষ্কার করে, বাঁধ তৈরি করে, মাছচাষ ও কৃষিকাজ শুরু করে মরিচঝাঁপিতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। দেশছাড়া মানুষ, নিজের দেশেই আশ্রয়হীন—সুন্দরবনের প্রতিকূল পরিবেশে কোনোমতে জীবনযাপন করছিলেন তাঁরা।

কিন্তু এটাও তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের সহ্য হয়নি।

২৬ জানুয়ারি ১৯৭৯। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নির্দেশে মরিচঝাঁপির উপর সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করা হয়। নদীতে পুলিশি ব্যারিকেড বসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে উদ্বাস্তুরা পাশের গ্রাম কুমিরখালি থেকে খাবার, ওষুধ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেও না যেতে পারেন।

৩১ জানুয়ারি ১৯৭৯, দুপুরে পুলিশ বাহিনী মরিচঝাঁপিতে ঢুকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। তৎকালীন পুলিশ মন্ত্রী কে ছিল একটু খোঁজ নিন তো। অনেকে তো আবার সাদা ধুতিতে দাগ খুঁজে পান না।  সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীকালে পুলিশের মদতে বামফ্রন্টের দলীয় ক্যাডাররা প্রায় ৩০০টি পরিবারের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। যারা বেঁচে ছিলেন, তাঁদের জোর করে আবার পাঠিয়ে দেওয়া হয় মল্কানগিরি, মানা, কুরুত, আদিলাবাদে। কেউ কেউ প্রাণ বাঁচিয়ে কদম্বগাছি, মালতিপুর, বারাসাত, বর্ধমান, হিঙ্গলগঞ্জ, ক্যানিংয়ে আশ্রয় নেন।

সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা জানানো হয়নি। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে জানা যায়, পাঁচ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তখন কেউ খুব একটা মাথা ঘামায়নি। উদ্বাস্তু হিন্দুদের নাগরিকত্ব তখন কারও বিবেক নাড়ায়নি।

আজ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে যাঁরা কাঁদছেন, তাঁরা কি কখনও মরিচঝাঁপির দিকে তাকিয়েছেন। যাঁরা মানুষ মারতে দ্বিধা করেননি, তাঁরা আজ মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেন কীভাবে।

মুর্শিদাবাদে ৩০ শতাংশ হিন্দুকে কেটে ভাগীরথীতে ভাসানোর হুমকি দেওয়া হুমায়ুনের সঙ্গে আজ বামফ্রন্ট জোট করে। ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরে ISF ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে হাত মেলায়। তৃণমূল কংগ্রেসের কথা আলাদা করে বলার দরকার নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত পশ্চিমবঙ্গের ৩৭ শতাংশ মুসলমানের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর শাসনে হিন্দুরা বারবার অত্যাচারিত। পুজোর অনুমতি থেকে ধর্মীয় আচরণ পালন—সবকিছুর জন্য হিন্দুদের আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। মুসলমানদের দ্বারা অত্যাচারের সময় পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মুর্শিদাবাদের হরগোবিন্দ ও চন্দন দাস, মোথাবাড়ির হিন্দুদের ঘরছাড়া হওয়ার ঘটনা—সবই পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার ফল।

বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও তৃণমূল মিলেই আবার পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের উদ্বাস্তু করার রাজনীতি করছে।

কিন্তু স্পষ্ট করে বলা দরকার—আরেকটা মরিচঝাঁপি হতে দেওয়া হবে না।

উদ্বাস্তু হিন্দুদের কথা বরাবর ভেবেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ড হিসেবে। বাংলাদেশে ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে আসা হিন্দুদের জন্যই আনা হয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, যার মাধ্যমে আজ হাজার হাজার উদ্বাস্তু হিন্দু নাগরিকত্ব পাচ্ছেন।

২০২৫ সালের Immigration and Foreigners Exemption Order এনে কেন্দ্রীয় সরকার নিশ্চিত করেছে যে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে আসা হিন্দুদের বিরুদ্ধে ভারতে কোনও মামলা করা যাবে না। অত্যাচারিত হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি।

মালদা থেকে মুর্শিদাবাদ, গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যখনই হিন্দুরা বিপদে পড়েছে, তখন বিজেপি পাশে দাঁড়িয়েছে—হাইকোর্টে মামলা করেছে, রাস্তায় নেমেছে, সাংগঠনিকভাবে লড়েছে।

শত চেষ্টা করেও সত্য মুছে ফেলা যাবে না।
আমরা হিন্দুদের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।
হিন্দুদের অধিকার রক্ষার জন্য যতদূর যাওয়ার দরকার, আমরা ততদূর যাব।

- তরুণজ্যোতি 

Comments

Popular posts from this blog

আমি কেন গান্ধীকে হত্যা করেছি!

বড়দিনকে হিন্দুয়ানায় বেঁধেছিলেন স্বামীজি, তুলসী-পূজনেও সে বাঁধন অটুট।

দীনদয়াল উপাধ্যায় ও অখণ্ড মানবতাবাদ''