পুরাণে একটা দৃশ্য আছে, যেটা আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, কিন্তু সত্যি বলতে কী—ঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা খুব কমই করি।


হিরণ্যকশিপু বধের পর নরসিংহ শান্ত হলেন না।
বরং আরও ভয়ংকর হয়ে উঠলেন।

এটাই সেই জায়গা, যেখানে গল্পটা শুধু “দেবতা বনাম অসুর” থাকে না—এটা সরাসরি মানুষের মনস্তত্ত্বে ঢুকে পড়ে।

নরসিংহ অবতার ছিল সীমার বাইরে।
না পুরো মানুষ, না পুরো পশু।
না দিন, না রাত।
না ঘর, না বাইরে।
না অস্ত্র, না অনস্ত্র।

মানে—সব নিয়ম ভাঙা একটা রূপ।

হিরণ্যকশিপু মারা গেল, কিন্তু নরসিংহের রাগ থামল না।
কারণ রাগটা আর বাইরের শত্রুর জন্য ছিল না।
ওটা তখন নিজের ভেতরের আগুন।

এখানেই একটা খুব অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে আছে।

আমরা অনেক সময় ভাবি—
“যাকে মারতে চেয়েছিলাম, তাকে হারালেই শান্তি আসবে।”
“যার বিরুদ্ধে লড়াই, সে শেষ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু বাস্তবে কী হয়?

ট্রমা শেষ হয় না।
শরীর থামে না।
নার্ভাস সিস্টেম বুঝতে পারে না যে যুদ্ধ শেষ।

নরসিংহ তখন সেই অবস্থা।

হিরণ্যকশিপু শুধু একটা ব্যক্তি ছিল না।
সে ছিল অত্যাচার, ভয়, অবদমন, অহংকার—সবকিছুর প্রতীক।

তাকে মারার জন্য যে শক্তি ডাকা হয়েছিল, সেই শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে, কাজ শেষ হওয়ার পর আর নিজেকে গুটোতে পারছিল না।

আজকের ভাষায় বললে—
নরসিংহ ছিল একেবারে fight-response stuck mode-এ।

এজন্যই লক্ষ্মী দেবী—যিনি শান্তি, সৌন্দর্য, সম্পর্ক, nurturing-এর প্রতীক—নরসিংহের কাছে যেতে পারেননি।

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

কারণ ট্রমাটাইজড রাগী মন শান্তির ভাষা বোঝে না।
ভালোবাসা তখন threat মনে হয়।
স্নেহ তখন invasion লাগে।

অনেক মানুষ আছে, যারা খুব রেগে থাকে, খুব কঠিন হয়ে যায়—
আর আমরা বলি, “এত ভালোবাসা পাচ্ছো, তবুও কেন শান্ত হচ্ছ না?”

কারণ nervous system তখনও লড়াই করছে।

লক্ষ্মী সেখানে ব্যর্থ হলেন, কারণ তাঁর শক্তি ছিল soft regulation।
কিন্তু নরসিংহের প্রয়োজন ছিল raw containment।

এখানেই প্রবেশ করেন কালী—চামুণ্ডা রূপে।

এটা খুব ভুল বোঝা একটা অংশ।
অনেকে ভাবে কালী নরসিংহকে “হারালেন”।
আসলে না।

কালী নরসিংহকে দমন করেননি।
তিনি নরসিংহের শক্তির সঙ্গে ম্যাচ করেছিলেন।

চামুণ্ডা রূপ মানে—
রক্ত, শ্মশান, মৃত্যু, কাঁচা বাস্তবতা।
কোনো সুন্দর মুখোশ নেই।
কোনো “সব ঠিক হয়ে যাবে” নেই।

মনস্তত্ত্বে যাকে বলে—
mirror containment।

যখন কেউ extreme rage বা trauma-তে থাকে, তখন তাকে শান্ত হতে বললে কাজ হয় না।
বরং তার রাগকে কেউ যদি সহ্য করতে পারে, ধরে রাখতে পারে, ভয় না পায়—
তবেই ধীরে ধীরে রাগ নিজে থেকে নেমে আসে।

চামুণ্ডা সেই কাজটাই করলেন।

তিনি নরসিংহের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন না—
“তুমি খারাপ”
বা
“এত রাগ ঠিক না”

তিনি বললেন—
“আমি তোমার থেকেও ভয়ংকর হতে পারি।
তোমার আগুনে আমি পুড়ব না।”

এই মুহূর্তে নরসিংহ প্রথমবার থামলেন।

কারণ finally—
তার রাগ আর একা ছিল না।

এটা খুব গভীর মনস্তত্ত্ব।

অনেক মানুষের জীবনে লক্ষ্মী আসে—
ভালো সম্পর্ক, ভালো কাজ, নিরাপত্তা, সুযোগ।

কিন্তু তারা সেটা নিতে পারে না।
কারণ ভিতরে একটা নরসিংহ তখনও দাঁড়িয়ে।

আর কালী না এলে, লক্ষ্মী স্থায়ী হয় না।

এই কারণেই শাক্ত দর্শনে কালী আগে, লক্ষ্মী পরে।

প্রথমে shadow regulate করতে হবে।
তারপরই softness possible।

নরসিংহ আর কালী—এরা আসলে আলাদা না।
এরা একই শক্তির দুই ফেজ।

একটা destruction-এর, একটা integration-এর।

আমাদের ভিতরেও এটা ঘটে।

যখন কেউ বছরের পর বছর অপমান সহ্য করে, ভয় পায়, নিজেকে চেপে রাখে—
একদিন কিছু একটা ট্রিগার হলে, সে “অতিরিক্ত” রেগে যায়।

লোক বলে—
“এত রাগ করার কী ছিল?”

কিন্তু আসলে সেটা আজকের রাগ না।
ওটা জমে থাকা বহু বছরের নরসিংহ।

এই রাগকে যদি সমাজ শুধু দমন করে,
বা spiritual bypass করে—
“মাফ করে দাও”, “ভুলে যাও”—
তাহলে সেটা আরও বিকৃত হয়।

কালী সেখানে প্রয়োজন।

মানে—
নিজের অন্ধকারকে স্বীকার করা।
নিজের রাগকে demonise না করা।
নিজের ভাঙা অংশকে ভয় না পাওয়া।

এই কারণেই কালী সুন্দর নন—
তিনি সত্য।

আর সত্য প্রথমে অস্বস্তিকর।

চামুণ্ডা রূপে কালী নরসিংহকে থামিয়েছিলেন কারণ তিনি তাকে “শান্ত” করেননি—
তিনি তাকে সম্পূর্ণ করেছিলেন।

শেষে নরসিংহ বসেছিলেন।
রাগ ধীরে ধীরে নেমে এসেছিল।
প্রহ্লাদ সামনে এসেছিল।

এটাও প্রতীক।

শিশু-চেতনা, নিষ্কলুষ বিশ্বাস, vulnerability—
এইগুলো তখনই সামনে আসে, যখন রাগ নিরাপদভাবে ধরে রাখা হয়।

সরাসরি ভালোবাসা দিয়ে না।
আগে containment, পরে connection।

এই গল্পটা শুধু দেবতার না।
এটা আমাদের প্রত্যেকের।

যদি কখনো দেখো—
ভেতরে একটা ভয়ংকর আগুন,
যেটা ভালো কথা শুনে থামে না—

নিজেকে দোষ দিও না।

হয়তো তোমার ভিতরে এখনো নরসিংহ আছে।
আর লক্ষ্মী নয়—
এই মুহূর্তে তোমার প্রয়োজন কালী।

ভয়ংকর না।
সৎ।

কারণ সত্যিকারের শান্তি আসে
রাগ মেরে ফেললে না,
রাগকে বোঝালে।
Collected

Comments

Popular posts from this blog

বড়দিনকে হিন্দুয়ানায় বেঁধেছিলেন স্বামীজি, তুলসী-পূজনেও সে বাঁধন অটুট।

আমি কেন গান্ধীকে হত্যা করেছি!

প্রসঙ্গ মরিচঝাঁপি।