কে এই কমিউনিস্ট নেতা বিশ্বাসঘাতক???
১৯৪২ সালের ডিসেম্বর মাসে নেতাজির সহচর কমিউনিস্ট নেতা ভগতরামকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দীতে সে নেতাজীকে বিশ্বাসঘাতক বলে। এবং সে যে নেতাজীর সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় বেইমানি করেছে, সেটাও স্বীকার করে। তার ফলে নেতাজীকে আশ্রয় দেওয়া উত্তম চন্দ গ্রেপ্তার হন।
মানব মনস্তত্ত্ব বিশাল জটিল জিনিস। দুর্বল পুরুষরা জোর গলায় পৌরুষের অহংকার করে বেড়ায়। আর বিশ্বাসঘাতকরা আজকাল সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদের মত অন্য ঘরানার নেতাদের খুঁত ধরে বেড়ায়।
————
তথ্যসূত্র সহ পুরাতন পোস্ট:
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি টাইমলাইন আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। অনেকেই জানেন। তাও আরেকবার...
১৯৪১ সাল। জানুয়ারি ১৬-১৭। এলগিন রোডের বাড়ি থেকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বেরিয়ে এলেন। কলকাতা থেকে বেরালেন ইন্সুরেন্স এজেন্ট মহম্মদ জিয়াউদ্দিন পরিচয়ে। ব্রিটিশ আমলে মুসলিম পরিচয় নেওয়াটা তুলনামূলকভাবে সেফ ছিল বলেই কি এমন ছদ্মবেশ? সেই নিয়েও বিতর্ক আছে। সে থাক।
১৯৪১ সাল। জানুয়ারি। স্থলপথে পেশোয়ার পৌঁছলেন সুভাষচন্দ্র বসু। উদ্দেশ্য আফগান প্রদেশ পেরিয়ে যাওয়া এবং সোভিয়েত রুট ধরা।
যাইহোক। এইবার ক্ষুরধার মেধার অধিকারী শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু একটি ভুল করলেন। যে ভুল ভবিষ্যতে বদলে দেবে পরাধীন ভারতের ভাগ্য।
ভুল লোককে বিশ্বাস করলেন। অথবা তিনি কোনোদিন ভাবতে পারেননি পরাধীন ভারতবর্ষের কোনো মানুষ শুধুমাত্র মতাদর্শগত পার্থক্যের জন্য এইভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে তাঁর সঙ্গে। কারণ অতীতেও গান্ধী হোক বা নেহরু, মতাদর্শের সংঘাত তাঁর সঙ্গে অনেকের অনেকবারই হয়েছে। কিন্তু সেটা মতাদর্শগত সংঘাত হয়েই থেকেছে।
যাইহোক, তিনি বিশ্বাস করলেন তৎকালীন এক কমিউনিস্ট ভগতরাম তলোয়ারকে। এবং তাঁর সঙ্গে নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে পৌঁছলেন কাবুল। জার্মানি এবং রাশিয়া দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ করলেন সুভাষ।
এখন, এই ভগতরাম তলোয়ার ‘সিলভার’ ছদ্মনামে নেতাজীর উপস্থিতির খবর পাচার করা শুরু করলো রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সকে। এবং সেই সঙ্গে খবর পেলো ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স এম আই সিক্স। তখন ব্রিটিশ এবং সোভিয়েত রাশিয়া পাশাপাশি এসেছে অনেকটাই। রাশিয়া থেকে সাহায্য পেলেন না সুভাষ।
১৯৪১, মার্চ। সুভাষ বাবুর সোভিয়েত প্ল্যান ধ্বংস হওয়ার পেছনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সিলভারের বিশ্বাসঘাতকতা, যে দেশের থেকেও বামপন্থার আদর্শকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল। সুভাষ বাবুও বোধহয় ইন্টেলিজেন্স ফেলিওরের ব্যাপারটা বুঝেছিলেন।
তবুও শেষ চেষ্টা করলেন ইটালিয়ান-জার্মান রুট ব্যবহার করে মস্কো পৌঁছে। কিন্তু কাজ কিছুই হলো না।
১৯৪১, এপ্রিল। শেষমেষ বার্লিন পৌঁছলেন সুভাষচন্দ্র বসু। এরপরের কথা এই পোস্টে অপ্রয়োজনীয়।
১৯৪২। ব্রিটিশদের হয়ে ‘অফিসিয়ালি’কাজ শুরু করেন ভগত রাম। কোডনেম হয় সিলভার। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেন নেতাজীকে এবং আরো অনেক বিপ্লবীকে শেল্টার দেওয়া কাবুলের ব্যবসায়ী উত্তম চন্দ সহ অনেকে।
যাইহোক। কেন এমন বিশ্বাসঘাতকতা করলেন ভগতরাম?
আমরা তৎকালীন বিপ্লবীদের জার্নাল থেকে পাই (জেলে ত্রিশ বছর ও পাক ভারত স্বাধীনতা সংগ্রাম, শৃঙ্খল ঝঙ্কার ইত্যাদি) যেহেতু সোভিয়েত রাশিয়া এবং ব্রিটেন সেই সময় বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানে আছে, তাই ব্রিটিশ বিরোধিতা হয়ে গিয়েছিল বামপন্থী কমিউনিস্টদের কাছে অপরাধ। ‘জন যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টের বিরোধিতা করেছিলেন তাঁরা।
উদাহরণস্বরূপ বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর বই জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম বইটি থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি পাঠকদের উদ্দেশ্যে:
“স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন চলিতেছিল তখন কমুনিষ্ট পার্টি দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে (বিশ্বযুদ্ধ) জনযুদ্ধ বলিয়া প্রচার করিয়া দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করিয়াছে। তাহারা ভারতের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেয় নাই, রুশিয়ার বন্ধু বলিয়া বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদকেই তখন কার্যতঃ সমর্থন করিয়াছেন।”
যাইহোক, এই ভগতরামও ব্যতিক্রম নন। তিনিও তাঁর পার্টির লাইনেই চলছিলেন।
সিলভারকে এই বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার অবশ্য দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। দিল্লিতে ভগতরামের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল গৃহকর্মী এবং সিকিউরিটি গার্ড সমেত। ভগতরাম হিল স্টেশন বা অন্য কোন জায়গায় বেড়াতে গেলে খরচ বহন করত ব্রিটিশ সরকার।
ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার ই ডব্লিউ ওয়েসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায় কমিউনিস্ট ভগতরাম ব্রিটিশদের থেকে এক মোটা রকম অর্থ নেতাজির সঙ্গে বেইমানির পারিশ্রমিক হিসেবে আদায় করেছিলেন।
ভগতরাম কতটা টাকা পেয়েছিলেন সেটার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কারণ ব্রিটিশরা ভগতরামের সঙ্গে বেইমানি করেননি... 🙂
তথ্যসূত্র:
1. The Indian Spy, Mihir Bose
2. Subhas Chandra Bose: The Springing Tiger, Hugh Toye
Comments