জানেন কি, বেগুনের জন্ম কৈলাসে?
ব্রহ্মলোকে বেগুন নেই, বিষ্ণুলোকে বেগুন নেই, ইন্দ্র, বরুণ, সূর্যদেব দুটো বেগুনের জন্যে কত না হাপিত্যেশ করেন, আর দেবাদিদেব মহাদেব কিনা ফি রোজ বেগুন ভাজা দিয়ে ভাত খান! আর তাই সব দেবতা রেগে গিয়েই ওটার নাম দিয়েছে, ‘বে-গুণ'। আঙুর ফল টক, আর কী!
কিন্তু যা ব্রহ্মলোকে নেই, বিষ্ণুলোকে নেই, তা আমাদের এই মর্তলোকে কীভাবে এল, জানেন কি? সে এক কাহিনি!
শিবের অনুচর দেদার। নন্দী, ভৃঙ্গী, ঘন্টাকর্ণ, বীরভদ্র, আরও কত ভূত পিশাচের দল। কেউ বাবার জন্যে কেউ সিদ্ধি কোটে, কেউ ছিলিম সাজায়, কেউ অনুপান সাজায়। তেমনই একজনের নাম বিঘোর। সে বাগানের সুপারভাইজার। কৈলাসে শিবালয়ের পিছনের বাগানে বেগুনের বিশাল চাষ ওই তো সামলায়। প্রতিদিন বেগুন কাঁটার খোঁচা খেয়ে বেছে বেছে ওই তো বেগুন নিয়ে আসে বাবার জন্যে। বাবার আর তো কোন চাহিদা নেই। দিনভর সিদ্ধি-ভাঙ; আর স্রেফ ভাতের পাশে কটা বেগুন ভাজা ছাড়া।
তা একদিন হয়েছে কী, বিঘোর ব্যাটা ধুতুরার বীজ খেয়ে কৈলাসের ফুটপাতে ফুলহার নামে এক যক্ষিণীকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে হাতটি ধরে ফেলেছে। বিষম রেগে মহাদেব মদনের মতো ভস্মই করে দিচ্ছিলেন, পরে দয়া করে কৈলাস থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুকুম দিলেন।
বাক্স প্যাঁটরা বেঁধেই ফেলেছিল বেচারা; শেষটায় ঘণ্টাকর্ণর বুদ্ধিতে সোজা আপিল করে মা পার্বতীর কাছে।
পার্বতী তো বিঘোরের মুখ দেখেই বুঝলেন, বেচারা নির্দোষ। তদন্তে প্রকাশ পেল, বিঘোর নয়, বেটি ফুলহারই পাজির পাঝাড়া। ওরই আসকারায় কদিন ধরেই তাঁদের এই প্রেম পর্ব চলছে।
কী চাস বল দেখি? দুটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন পার্বতী।
দুজনেই অধোবদন। দ্যাখ বাছারা, বললেন দেবী, তোরা প্রেম করেছিস। কিন্তু পিশাচের সঙ্গে কি যক্ষিণীর বিয়ে হয়?
দেবী কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন, অন্তত স্বর্গলোকে তো হবে না। কাজেই উপায় একটিই। দুজনকেই মানব জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে যেতে হবে।
একটা পাকা বেগুন বিঘোরের হাতে দিয়ে বললেন, একটাই তো কাজ জানিস, বেগুনের চাষ। এটা নিয়েই করে খাবি পৃথিবীতে। তারপর কাজললতা থেকে দুজনের চোখে কাজল পরিয়ে দিতেই ভুস করে কৈলাস থেকে উবে গেল দুজনে।
পরদিন দুপুরে মহাদেব দেখলেন গরম ভাতে পাতে বেগুন ভাজা নেই। আরেকবার তাণ্ডব নেচে দেখাবেন নাকি ভাবলেন, কিন্তু ওই পর্যন্তই। সাহসে কুলোল না। পাশেই পার্বতী বসে আছেন; ভয়ে ভয়ে তাকালেন।
অন্তর্যামিনী বললেন, ওরম ধরা পড়া ছাগল চোরের মতো তাকাচ্ছ যে? বিঘোর মর্তে মানুষ হয়ে সংসার করছে। তোমার জন্যে বাগান থেকে কাঁটা খেয়ে কে বেগুন তুলে আনবে শুনি?
তাই তো! ঘোরে ভুলেই গিয়েছিলেন বিষয়টা। কিন্তু বেগুনের অভাবে তো শিবলোক অচল হয়ে যাবে। সোজা ধ্যান যন্ত্রে ধরলেন যমরাজকে। যমরাজ থেকে চিত্রগুপ্ত। চিত্রগুপ্ত খাতা উল্টে টোকেন কেটে ধরিয়ে দিলেন দুই যমদূত চণ্ড, আর প্রচণ্ডকে।
এদিকে বিঘোর, আর ফুলহার দুটিতে সংসার করেছে বহুদিন হল। সাদামাটা জীবন। বিঘোর বেগুনের চাষ করে। পৃথিবীতে এর আগে কেউ বেগুনের চাষ জানত না। তাই বেগুনের খুব চাহিদা। বেগুন বেচে দুটো পয়সা হয়, তাই দিয়ে চাল কেনে, ডাল কেনে, পয়সা বাঁচলে ফুলহারের জন্যে নিয়ে আসে ডুরে শাড়ি, মোতির মালা। ফুলহার হাসে।
তা কত বয়স হল তাঁদের? আশি তো পার হয়েইছে। এবার ডাক এলে যাওয়াই যায়। তবে কে আগে যাবে, সেই নিয়ে চিন্তা। সন্ধেয় খাওয়া সেরে দাওয়ায় বসে দুটিতে এই নিয়েই গল্প হচ্ছিল, আর তক্ষুনি হাজির চণ্ড, আর প্রচণ্ড।
চণ্ড বলল, চিন্তা নেই। হুকুম হয়েছে দুজনেই যাবে একসাথে।
প্রচণ্ড বলে, কী, মনে পড়ে কৈলাসের কথা?
না তো। কিচ্ছু মনে পড়ে না। বিঘোর ফ্যাল ফফ্যাল করে তাকায় ফুলহারের দিকে। কী বলে এরা? কৈলাস জ্যাঠার কথা বলছে নাকি? সে তো বহুদিন হল গত হয়েছেন?
তোমরা কারা গো? ফুলহার বলে, কী কথা বল তোমরা?
বুঝেছি। চণ্ড বলে, ঘটিটা এগিয়ে ধর দেখি।
বিঘোর ঘটিটা এগিয়ে ধরে চণ্ডের দিকে। চণ্ড ঘটিটা সুরধনীর জলে পূর্ণ করে বলে, দুজনে ভালো করে চোখ ধুয়ে নাও। মায়াকাজল পরে রয়েছ কিনা।
চোখে জল দিতেই সব মনে পড়ে গেল তাঁদের। কৈলাস; এ তো কালকেরই কথা। অথচ মর্তলোকে তাঁদের আশি বছর পেরিয়ে গেছে।
চলো। বলে যমদূতের হাত ধরে দুজনে।
পিশাচ আর যক্ষিণীর প্রেমে কোল আলো করে কেউ আসেনি; তবে জীবনটা সার্থক করে দুজন দুজনকে ভালো বাসতে পেরেছে।
বিঘোর, আর ফুলহার চলে গেল। রয়ে গেল বিঘোরের সেই বেগুনের গাছ গুলো। আর তাদের ভালোবাসা নদী হয়ে বইতে লাগল।
সেখানকার অধিবাসীরা বংশ পরম্পরায় ওই বেগুনেরই চাষ করে চলছে আজও। এক একটা বেগুন দেড় কেজি করে ওজন। ভাজলে ইলিশের মতো তেল বেরোয় বেগুন থেকেই।, যে না খেয়েছে নরম মাখনের মতো সেই বেগুন, সে বেঘোরেই আছে।
ওই জায়গাটার নাম? বিঘোরের নামে জায়গাটার নাম বিঘোর হাট। আর নদীর নাম ফুলহার। বিহারের কাটিহার জেলা। ডালখোলা থেকে কত আর দূর? ঢ্যাঙাদা আঁকশিতেই নাগাল পাবে। তবে ডালখোলার বাজারে বিঘোরেরই বেগুন পাওয়া যায় বছরের এই সময়টায়।
Comments