১৯৭১–এর গল্প এখানেই শেষ নয়।
১৯৭১ কোনো আবেগঘন গল্প নয়, কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের একটি নথিভুক্ত বাস্তবতা। সেই বাস্তবতায় ভারত ছিল কেবল একজন প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, ভারত ছিল আশ্রয়দাতা, অর্থদাতা, কূটনৈতিক ঢাল এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এই ভূমিকা কোনো একক সরকারের সদিচ্ছা ছিল না—এটি ছিল ভারতের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ত্যাগের ফল।
যখন পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণহত্যা ও নির্যাতন চলছিল, তখন ভারত সীমান্ত বন্ধ করেনি, ধর্মের হিসাব কষেনি, আন্তর্জাতিক চাপের কাছে মাথা নোয়ায়নি। বরং সীমান্ত খুলে দিয়েছিল, কোটি কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, এবং সেই বোঝা বহন করেছিল বছরের পর বছর। সেই ব্যয়ের ভার বহন করেছে ভারতের জনগণ—বাসের টিকিটে, সিনেমার টিকিটে, ডাকটিকিটে “Refugee Relief” সারচার্জ দিয়ে। এগুলো কোনো গোপন ইতিহাস নয়, এগুলো সরকারি দলিল, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্য।
কিন্তু ১৯৭১–এর গল্প এখানেই শেষ নয়।
১৯৭১ বাংলাদেশের জন্মের বছর—এ কথা সবাই জানে। কিন্তু খুব কম মানুষই মনে রাখতে চায়, জন্মের পর একটি রাষ্ট্রকে দাঁড় করিয়ে রাখতে কী লাগে। যুদ্ধ জেতা এক জিনিস, রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা আরেক। সেই দ্বিতীয় অধ্যায়েও ভারত নীরবে, ধারাবাহিকভাবে এবং দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশের পাশে ছিল—এটি কোনো মতামত নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নথি।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ভারত বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ফোরামে ভারতের অবস্থান ছিল স্পষ্ট—বাংলাদেশ একটি বাস্তবতা, তাকে অস্বীকার করা যাবে না। এই কূটনৈতিক সহায়তা ছাড়া নবজাত রাষ্ট্রের পথচলা আরও কঠিন হতো।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর পরই ভারত বাংলাদেশকে বিনা শর্তে ঋণ, অনুদান ও খাদ্য সহায়তা দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, ধ্বংসপ্রাপ্ত রেলপথ, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনে ভারত প্রযুক্তিগত ও মানবসম্পদ সহায়তা দেয়। এগুলো কোনো গোপন চুক্তি ছিল না—এগুলো ছিল প্রকাশ্য দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ভারতের সহায়তা আজও চলমান। সীমান্ত পেরিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানি ট্রানজিট, যৌথ বিদ্যুৎ প্রকল্প—এসবই আঞ্চলিক সহযোগিতার বাস্তব উদাহরণ। সংকটকালে ভারত কখনো বিদ্যুৎ বন্ধ করে রাজনৈতিক চাপ তৈরির পথ নেয়নি—যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বিরল সংযমের দৃষ্টান্ত।
যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্থলবন্দর, নৌপথ, রেল সংযোগ—এই সবকিছু পুনরায় কার্যকর হয়েছে ভারতের উদ্যোগে। বাংলাদেশের রপ্তানি–আমদানির একটি বড় অংশ আজও ভারতের ভৌগোলিক সুবিধার ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাকে কখনো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি—এটাই বাস্তবতা।
এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা খাদ্যসংকটের সময়েও ভারত বাংলাদেশকে কেবল “প্রতিবেশী” হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে দেখেছে। ভ্যাকসিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্যশস্য—এসব ক্ষেত্রে সহায়তা ছিল নিঃশর্ত, নিরবচ্ছিন্ন।
এই প্রেক্ষাপটে আজ, অর্ধশতাব্দী পরে, যখন বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক ভাষ্যকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা দেখা যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি কেবল মতপ্রকাশ, নাকি ইতিহাস অস্বীকারের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া?
ভারত সমালোচনাকে ভয় পায় না। কিন্তু সমালোচনা আর বিদ্বেষ এক নয়। কূটনৈতিক মতানৈক্য আর রাষ্ট্রীয় শত্রুতা এক জিনিস নয়। ইতিহাসকে নির্বাচিত স্মৃতিতে রূপান্তর করে, ভারতকে “শক্তি প্রদর্শনকারী শত্রু” হিসেবে উপস্থাপন করা স্বাধীন মত নয়—এটি দায়িত্বহীন রাষ্ট্রচিন্তার লক্ষণ।
ভারত কখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নিয়ন্তা হতে চায়নি। কিন্তু ভারত এটাও স্পষ্টভাবে জানে—একতরফা সহনশীলতা কোনো স্থায়ী কূটনীতির ভিত্তি হতে পারে না। বন্ধুত্ব পারস্পরিক সম্মানের ওপর দাঁড়ায়, ইতিহাস অস্বীকারের ওপর নয়।
ধর্মীয় উস্কানি, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এবং প্রতিবেশী-বিরোধী ভাষ্য—এই তিনের সমন্বয় যে কোনো রাষ্ট্রকে অস্থির করে তোলে। আজ যদি ভারতের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা হয়, তবে সেটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করবে।
ভারত সংঘাত চায় না—কিন্তু ভারত ইতিহাস ভুলেও যায় না। ভারত স্মরণ করিয়ে দিতে পছন্দ করে না—কিন্তু প্রয়োজন হলে নথি সামনে রাখে। কূটনীতি নীরব থাকতে জানে, আবার সীমারেখাও টানে।
বাংলাদেশের সামনে পথ এখনো খোলা— ইতিহাসের সঙ্গে সৎ সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মানের কূটনীতি, এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তা। অন্যথায় ইতিহাস সাক্ষী— যে রাষ্ট্র স্মৃতি ও সহায়তাকে অস্বীকার করে, সে রাষ্ট্র একদিন নিজের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাই হারায়।
জয় হিন্দ। জয় ভারত।🇮🇳
Comments